মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে যুদ্ধের দামামা বাজছে, তার আঁচ যে ভারতের শোবার ঘর পর্যন্ত পৌঁছাবে—তা হয়তো কেউ ভাবেনি। বিশ্ব রাজনীতির দাবার চালে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ওলটপালট হয়ে গেছে আন্তর্জাতিক পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা। আর এই ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার শিকার হয়েছে ভারতের জনস্বাস্থ্য রক্ষার অন্যতম হাতিয়ার কনডম। কাঁচামালের আকাশছোঁয়া দাম আর দুষ্প্রাপ্যতায় দেশটির কয়েক হাজার কোটি রুপির এই শিল্প এখন চরম সংকটে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
ভারতের বিশাল জনসংখ্যার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বছরে প্রায় ৪০০ কোটির বেশি কনডম তৈরি হয়। কিন্তু যুদ্ধের প্রভাবে লোহিত সাগরের বাণিজ্য পথ সংকটে পড়ায় থমকে গেছে সিলিকন অয়েল ও অ্যামোনিয়ার মতো জরুরি কাঁচামালের আমদানি। ফলে কনডম উৎপাদনকারী বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এখন উৎপাদন সচল রাখতেই হিমশিম খাচ্ছে। বৈশ্বিক লজিস্টিক চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভারতের প্রায় ৮ হাজার ১৭০ কোটি রুপির কনডম শিল্প এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে।
কাঁচামাল ও প্যাকেজিং উপকরণের দাম লাফিয়ে বাড়তে থাকায় খুচরা বাজারে এই জরুরি পণ্যটির দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা দেশটির জনস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে অ্যামোনিয়ার দাম ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়ায় উৎপাদনকারীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এর পাশাপাশি প্যাকেজিংয়ের জন্য ব্যবহৃত পিভিসি ও অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে লজিস্টিক জটিলতা এবং পেট্রোকেমিক্যাল খাতের অস্থিরতাও এই শিল্পকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। সম্প্রতি ভারতের এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, জ্বালানি ও শক্তি নিরাপত্তার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে অভ্যন্তরীণ পেট্রোকেমিক্যাল ইউনিটগুলোতে সম্পদ বরাদ্দ ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেওয়া হতে পারে।
এমনটি হলে কনডম উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানের জোগান আরও সংকুচিত হবে। ভারতের এই বাজার মূলত অধিক উৎপাদন ও স্বল্প মুনাফার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়, যাতে সাধারণ মানুষের কাছে পণ্যটি সুলভ থাকে। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির চাপে এই মডেলটি এখন অকার্যকর হওয়ার পথে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংকট কেবল ব্যবসায়িক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পরিবার পরিকল্পনা এবং যৌনবাহিত সংক্রমণ (এসটিআই) রোধে কনডম সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও কার্যকর মাধ্যম। উচ্চমূল্য বা বাজারে পণ্যের দুষ্প্রাপ্যতার কারণে যদি সাধারণ মানুষ এর ব্যবহার কমিয়ে দেয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশটিতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
ইতিমধ্যে দিল্লি ও মুম্বাইয়ের মতো বড় শহরগুলোর ফার্মেসিগুলোতে এই সুরক্ষা সামগ্রীর সংকট লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা আগামী দিনে এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকটের আগাম সতর্কবার্তা দিচ্ছে।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে

Post a Comment