স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, 'বাংলাদেশের মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এ সেতুর নামকরণ করা হয়েছে। আমরা এমন একটি রাষ্ট্র গঠন করতে চাই, যে রাষ্ট্র পানি ও সীমানাসহ যেকোনো ন্যায্য দাবি আদায়ে কোনো পরাশক্তির কাছে মাথা নত করবে না।'


বুধবার গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের পাঁচপীর বাজার-কুড়িগ্রাম চিলমারী উপজেলা সদর সড়কে তিস্তা নদীর উপর নির্মিত ১৪৯০ মিটার দীর্ঘ ‘মওলানা ভাসানী সেতু’ উদ্বোধন করেন উপদেষ্টা। পরে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি উপরোক্ত কথাগুলো বলেন।


তিনি আরও বলেন, 'সেতুটি চালু হওয়ার ফলে গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাটসহ পার্শ্ববর্তী জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। এর মাধ্যমে শিল্প ও কৃষিজাত পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে জাতীয় অর্থনীতি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।'


অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্টের (এসএফডি) এশিয়া অপারেশন্সের মহাপরিচালক ড. সৌদ বিন আয়েদ আল-শাম্মারি।


স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রশিদ মিয়ার সভাপতিত্বে এসময় আরও বক্তব্য রাখেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের যুগ্ম-সচিব শাহিনুর রহমান, প্রকল্প পরিচালক আব্দুল মালেক, গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক চৌধুরী মোয়াজ্জম আহমদ, জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, জেলা জামায়াতের সাবেক আমীর ডা. আব্দুর রহীম সরকার, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক বাবুল আহমেদ, জুলাই যোদ্ধা রাশেদুজ্জামান আশিক প্রমুখ।


বহুল প্রতীক্ষিত সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে সকাল থেকেই তিস্তা পাড়ে ভিড় জমায় দুই জেলার মানুষ। সুন্দরগঞ্জ ও চিলমারী উপজেলার হাজারো সাধারণ মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। কেউ পরিবারের সঙ্গে, কেউবা দল বেঁধে আসেন জীবনের ঐতিহাসিক এই মুহূর্তের সাক্ষী হতে। দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে দেখে তাদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে উচ্ছ্বাস আর গর্বের আলো।


এর আগে গত ১০ আগস্ট স্থানীয় সরকার বিভাগ এক প্রজ্ঞাপনে সেতুর নামকরণ করে ‘মওলানা ভাসানী সেতু, গাইবান্ধা’। ২০১৪ সালের ২৫ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এর ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেছিলেন। নানা জটিলতা ও একাধিকবার তারিখ পরিবর্তনের পর অবশেষে ১১ বছর পর চালু হলো এই সেতু।


এলজিইডি বাস্তবায়িত এবং বাংলাদেশ সরকার (জিওবি), সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (এসএফডি) ও ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ওফিড) এর যৌথ অর্থায়নে সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৯২৫ কোটি টাকা। চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড এর তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই প্রি-স্ট্রেসড কংক্রিট (পিসি) গার্ডার সেতুর দৈর্ঘ্য ১৪৯০ মিটার ও প্রস্থ ৯.৬০ মিটার। এটি দুই লেনবিশিষ্ট এবং মোট ৩১টি স্প্যান নিয়ে নির্মিত। প্রকল্পকে ঘিরে প্রায় ৮০ কিলোমিটার এক্সেস সড়ক তৈরি হয়েছে। এতে ৬৮টি বক্স কালভার্ট ও ৯টি আরসিসি সেতু রয়েছে। ফলে বেলকা বাজার, পাঁচপীর, ধর্মপুর, হাট লক্ষ্মীপুর, সাদুল্যাপুর ও ধাপেরহাটসহ অন্তত ১০টি বাজার সরাসরি সংযুক্ত হবে।


সেতুটি চালু হওয়ায় উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বল্প খরচে কৃষি ও শিল্পপণ্যের পরিবহন সম্ভব হবে, গড়ে উঠবে ছোট-মাঝারি শিল্প কারখানা। ঢাকাসহ দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি ভুরুঙ্গামারী স্থলবন্দরের দূরত্ব কমবে ৪০-১০০ কিলোমিটার। একইসঙ্গে পর্যটন খাতেও নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।


তবে সেতুর নামকরণ নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা ও সেতুর স্বপ্নদ্রষ্টা শরিতুল্যাহ মাস্টারের নামে নামকরণের দাবি জানিয়ে এলাকাবাসী একাধিকবার মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দিয়েছেন। তাদের দাবি, ১৯৯৫ সাল থেকে শরিতুল্যাহ মাস্টার আন্দোলন চালিয়ে ‘তিস্তা সেতু বাস্তবায়ন কমিটি’ গঠন করেছিলেন। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টাতেই এ সেতু বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে। তাই তাঁর স্মৃতি অম্লান রাখতে ‘শরিতুল্যাহ মাস্টার তিস্তা সেতু’ করার দাবি এখনও এলাকাবাসীর মধ্যে বিদ্যমান। সব বিতর্ক ছাপিয়ে দুই পারের মানুষ এখন উচ্ছ্বসিত। দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণে আজ থেকে শুরু হলো তাদের নতুন যাত্রা।


Post a Comment

Previous Post Next Post